“শুধু বলি ফিরে এসো”


বাবা আদর করে নাম দিয়েছিলেন মৃত্যুঞ্জয়। কারন,আমি জন্মেছিলাম এক দুরারোগ্য ব্যাধি নিয়ে।সবাই বলেছিল, আমি আর বাঁচবো না।তখন আমার বয়স দুই মাস।মাএ ‘দু’মাস বয়সে আমি মৃত্যুকে হারিয়ে, জীবন যুদ্ধে জয়ী হয়ে নতুন জীবন ফিরে পাই।কিন্তু সেই জীবনকি আমার সত্যিই কাম্য ছিল?
আমার বাঁচার কথা ছিল না।তবু বেঁচে আছি,অতৃপ্ত আত্নার মত।আত্নার কোন রক্ত-মাংশের শরীর থাকে না,কিন্তু জগতের সবার মত আমারও শরীর রয়েছে।তারপরও আমি অতৃপ্ত আত্না।নিজেকে এখন জীবন্ত মানুষ বলে ভাবতে পারি না।মৃতদেহের উপর আঘাত করলে সে দেহ ব্যাথা পায় না;আমি আঘাত সইতে সইতে নির্বাক হয়ে গেছি।এখন আর ব্যাথা পাই না।স্বাধীনতার গর্ব নিয়ে বেঁচে আছি মাএ।
ছয় বছরের ছোট খোকার রক্তস্নাত ছবিটা এখনো মানসপটে ভেসে উঠে।সেই যে স্কুলে যাওয়ার সময় বলে গেল-“বাবা, আমি খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসবো “।আমি নিষেধ করেছিলাম, যে কোন সময় পাকিস্তানী বাহিনী হানা দিতে পারে।শুনলো না আমার কথা।বলল -বাবা,লেখা পড়া না করলে আমি বড় হব কিভাবে? দেশকে স্বাধীন করবো কিভাবে?মায়ের দেশ মাকেই উপহার দিব।হ্যা,আমার খোকা কথা রেখেছিল। সাদা কাফনের কাপড়ে নতুন সাজে খোকা আমার কাছে ফিরে এসেছিল।গাছের ডালে ভাইয়ের রক্তাক্ত ঝুলন্ত লাশের স্মৃতি এখন আমাকে আর কাঁদায় না।বিশ্বাস করো,ও আর কোনদিন স্বাধীনতা চাইবে না….কোন দিন না।হায়নার দল ওর কণ্ঠ চিরতরে রুদ্ধ করে দিয়েছে,কিন্তু আত্নার কণ্ঠ রুদ্ধ করতে পারেনি।’দু’চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে একমাত্র মেয়েটি আমার সাজানো সংসার জীবন শুরু করেছিলো।অতঃপর, একদিন সন্ধ্যার আলো-আঁধারীতে রাস্তার পাশের গমক্ষেতে তার শতচ্ছিন্ন দেহটি খুঁজে পাওয়া গেল। ওদের পশুত্বের ক্ষত চিহ্ন নিয়ে সেও পাড়ি জমালো অচেনার দেশে,না ফেরার দেশে।আমি কি সত্যি পাগল হয়ে গেছি!হয়তো,হয়তোবা না।আমার অনেক আগেই পাগল হওয়ার কথা ছিল।বোমায় বিধ্বস্ত বাবা-মা আর স্ত্রীর ক্ষত -বিক্ষত দেহ;শকুনের ভয়ার্ত চাহনি দেখে আমি কেন পাগল হলাম না!
হ্যা পাগল হইনি।কারন,যাদের আমি হারিয়েছি তাদেরকে ফিরে পাই ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবসে হাজার হাজার মানুষের বিজয়ের মিছিলে।তারাও আনন্দ মিছিলে অংশ নেয়।এই দিনাটির অপেক্ষায় থাকি আমি।শুধু বলি ফিরে এসো,তোমরা;আমার এই অতৃপ্ত আত্নাকে মুক্ত করে দিতে।

লেখক:জেনিলিসা মিম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *